বিস্তারিত

হ্যাকিং নয়, বাংলাদেশ ব্যাংকে ডিজিটাল ডাকাতি হয়েছে : বিএনপি

bdnews,bd news,bangla news,bangla newspaper ,bangla news paper,bangla news 24,banglanews,bd news 24,bd news paper,all bangla news paper,all bangla newspaper ছবি : সংগ্রহকৃত

সুইফট’ সিস্টেম ব্যবহার করে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ১০১ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৮শ’ কোটি টাকা) ফিলিপাইন ও শ্রীলংকায় স্থানান্তরের ঘটনাকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিজিটাল ডাকাতি হিসেবে দেখছে বিএনপি। দলটি বলেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরের উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিদের যোগ-সাজসে এই ঘটনা ঘটেছে যা ‘হ্যাকিং’ নয়, ডিজিটাল রোভারিং’ বা ডিজিটাল ডাকাতি। বাংলাদেশ ব্যাংকের অথরাইজ পারসন বা সুইফট সিস্টেমের পাসওয়ার্ড ব্যবহারকারী কর্মকর্তাকে জিজ্ঞেস করলেই রিজার্ভ চুরির রহস্য উদ্ঘাটন হবে। আজ মঙ্গলবার দুপুরে গুলশানে বিএনপির চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের ১০১ মিলিয়ন ডলার (৮০০ কোটি টাকা) লুণ্ঠন একটি বিশ্লেষণাত্মক পর্যালোচনা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে একথা জানানো হয়। দলটির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার শামা ওবায়েদ এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন।

সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, শেয়ারবাজার, হলমার্ক, ডেসটিনি কেলেঙ্কারির পর রিজার্ভ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ চুরি কেবল আর্থিক ক্ষতি নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বর জন্য হুমকি স্বরূপ। তিনি বলেন, রাজকোষের এই লুণ্ঠন আমাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থার নিরাপত্তা ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের ওপর চরম আঘাতের শামিল। এই ভয়াবহ ঘটনায় দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি জনগণ আস্থা হারাবে। শুধুমাত্র গভর্নরের পদত্যাগে এই সমস্যার সমাধান নয়, নিরপেক্ষ সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উৎঘাটন করে দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। তিনি বলেন, সরকার কোনোভাবেই এ ঘটনার দায় এড়াতে পারে না।

তারা (সরকার) এখন পর্যন্ত এ ঘটনার কোনো বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যাও দিতে পারেনি। প্রশ্ন-উত্তর পর্বে অংশ নেন বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, এই রিজার্ভ চুরিতে যারা বেনিফিশিয়ারী, সেই ফিলিফাইনে তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে, সিনেটে শুনানি হচ্ছে, কিন্তু বাংলাদেশ নীরব। এই নীরবতার কারণ কি? তা আমাদের খতিয়ে দেখতে হবে। গত ৪ ও ৫ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ৮শ’ কোটি টাকা লোপাটের বিশ্লেষণাত্মক পর্যালোচনা প্রজেক্টরের মাধ্যমে উপস্থাপন করতে গিয়ে শ্যামা ওবায়েদ বলেন, সুইফট বিশ্ব পরিসরে ফাইন্যানসিয়াল ইন্সটিটিউশন সমূহের মাধ্যমে আর্থিক লেন দেনের তথ্য পেয়ে থাকে। এরজন্য রয়েছে রুদ্ধ মানসম্পন্ন নেটওয়ার্ক।

প্রত্যেক সদস্য ব্যাংক লাইসেন্স প্রাপ্ত হয়ে একটি একক পরিচিত কোড, সফটওয়ার এবং সেবা পায়, যার দ্বারা সুইফটনেট সাথে যুক্ত হতে পারে। এটি প্রতিদিন দুই কোটি আর্থিক বার্তা আদান-প্রদান করে এবং এর সাথে বিশ্বের ১০ হাজারের বেশি আর্থিক প্রতিষ্ঠান জড়িত। ব্রিফিংয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইউনির্ভাসিটি অব ক্যালিফোনিয়া’র কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ম্যাট বিশপ স্কাইপে সরাসরি তার মতামত ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, এটা স্পষ্ট যে, কোথাও না কোথাও খারাপ লোকদের দুরভিসন্ধি জড়িত। যেকোনো ব্যক্তির যার সুইফট সিস্টেমটি ব্যবহারের অনুমতি আছে এবং তিনি ছাড়া অন্য কেউ এই সিস্টেমে প্রবেশ করার অনুমতি নাই, এমন কেউ এতে জড়িত ছিলো। ‘ম্যালওয়ার’ এর মাধ্যমে ওই অর্থলোপাটের সম্ভাবনাকেও নাকচ করে দেন কম্পিউটার বিজ্ঞানের এই অধ্যাপক।

এই সংবাদ সম্মেলনকে রাজনৈতিকভাবে না দেখে একটি নির্মোহ প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ হিসেবে দেখার অনুরোধ জানিয়ে শামা ওবায়েদ বলেন, সুইফট বেলজিয়ামভিত্তিক এমন একটি প্রতিষ্ঠান যা বিশ্ব পরিসরে ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউটগুলোর আর্থিক লেনদেনের প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিশ্লেষক শেইন শুক এর বক্তব্য উদ্ধৃতি করে শ্যামা ওয়ায়েদ আরো বলেন, আমরা তার সাথে যোগাযোগ করেছি। তিনি বলেছেন, ভেতরকার মানুষ জড়িত না থাকলে এটি প্রায় অসম্ভব। যদি ভেতরকার লোকজন জড়িত না থাকে, তাহলে আক্রমণকারীদেরকে ভেতর থেকে সহায়তা করা হয়েছে। এই ধরণের অপরাধ করার জন্য যেকোনো ব্যক্তির ব্যাংকিং শিল্প সম্পর্কে গভীর জ্ঞান থাকতে হবে। বিষয়টির ব্যাখা করে বিএনপির এই নেত্রী বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকও সুইফট’র নিরাপত্তাগত সহযোগিতা গ্রহণ করে। বাংলাদেশ ব্যাংকে রয়েছে সুইফট কর্তৃক সরবরাহ করা একটি নেটওয়ার্ক টার্মিনাল। এ টার্মিনালে মাত্র তিনটি কম্পিউটার ব্যবহার হয়। এই কম্পিউটারগুলো বাংলাদেশে ব্যাংকে ব্যবহৃত অন্যসব কম্পিউটার থেকে একেবারে ভিন্ন। একটি নিরাপত্তা দেওয়ালের মধ্যে এ কম্পিউটার তিনটি রাখা।

এ কম্পিউটার দিয়ে অন্য কোনো কাজ করা হয় না। এটি কেবল সুইফটের সাথে যোগাযোগ বার্তা আদান-প্রদানের জন্য ব্যবহার হয়। আর এটি যিনি ব্যবহার করেন, তিনি বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক অথরাইজ পার্সন। শামা ওবায়েদ বলেন, আমরা সুইফটের মাইক ফিশ’র সাথে যোগাযোগ করেছি। তিনি বলেছেন, সারা বিশ্বে ১০ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান সুইফটের সেবা গ্রহণ করছে। সুইফট প্রতিদিন দুই কোটি বার্তা দেয়া নেয়া করে। আমাদের তথ্য ভাণ্ডারে আজ পর্যন্ত অননুমোদিত তথ্য ঢোকেনি। সুইফট নেট টার্মিনাল ব্যবহারের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে শামা ওবায়েদ বলেন, সুইফট নেট টার্মিনাল একক নির্দিষ্ট সিস্টেম ব্যবহার করে। এর ফিজিক্যাল সিস্টেমের জন্য বিশেষ লাইসেন্সের ব্যবস্থা আছে। যেমন-ডঙ্গল (পেনড্রাইভের মত একটি যন্ত্র), যার মধ্যে রয়েছে একটি সার্টিফিকেট, অনুমোদিত ব্যবহারকারীর পাসওয়ার্ড। সুইফট সিস্টেম লগইন করা তখনই সম্ভব হয়, যখন সার্টিফিকেট ও পাসওয়ার্ড দু’টোই থাকে।

কারণ, ডঙ্গলের মধ্যে নিহিত সার্টিফিকেট ও পাসওয়ার্ড পরস্পর যৌথভাবে সংযুক্ত। সুতরাং অনুমোদিত ব্যক্তি ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের সুইফট সিসেস্ট অন্য কেউ ব্যবহারের সুযোগই নেই। তিনি দাবি করে বলেন, এই লুণ্ঠন বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ কারো কাজ। সব প্রামাণিক সাক্ষ্য, সুইফট নেট আর্কিটেচার ও বিশেষজ্ঞ মতামতের ভিত্তিতে এটা পরিস্কার যে, এই অর্থ লুণ্ঠন কোনো হ্যাংকি কিংবা ম্যালওয়ারের কারণে ঘটেনি।

এটি বাংলাদেশ ব্যাংকে একটি ডিজিটাল রাভারিং (ডিজিটাল ডাকাতি)। সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আ স ম হান্নান শাহ, ড. আবদুল মঈন খান, ভাইস চেয়ারম্যান শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ, আবদুল্লাহ আল নোমান, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, সেলিমা রহমান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ড. ওসমান ফারুক, ইনাম আহমেদ চৌধুরী, রিয়াজ রহমান, আবদুল আউয়াল মিন্টু, অধ্যাপক আবদুল মান্নান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাহবুবউল্লাহ, সাংবাদিক মাহফুজউল্লাহ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদের ধরন : বাংলাদেশ নিউজ : স্টাফ রিপোর্টার