বিস্তারিত

দেশবাসীকে জেগে উঠার আহ্বান খালেদা জিয়ার

ছবি : সংগ্রহকৃত

কেড়ে নেয়া অধিকার ফিরিয়ে আনতে দেশবাসীকে জেগে উঠার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধামন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। এসময় তিনি সকলের অংশগ্রহণে দেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে সরকারের প্রতি আবারো সংলাপের আহ্বান জানান। গতকাল শনিবার দুপুরে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে দলটির ৬ষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ আহ্বান জানান। খালেদা জিয়া বলেন, বাংলাদেশের মানুষসহ প্রায় সবাই দেশে একটি গণতান্ত্রিক ও জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকার দেখতে চায়। এমন একটি সরকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কীভাবে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে একটি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের আয়োজন করা যায় সেজন্য আমরা সরকারের প্রতি সংলাপের আহ্বান জানিয়েছিলাম। কিন্তু সরকার আমাদের আহ্বানে সাড়া দেয়নি। তিনি বলেন, সকলে মিলে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সংকটের নিরসন করতে পারলে আর আন্দোলনের প্রয়োজন হবে না কিন্তু সরকার বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা করছে। তারা শুভবুদ্ধির পরিচয় দেয়নি। তাই আমরা আবারো সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, আসুন আমরা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পথ খুঁজে বের করি।

আগামী দিনে দেশ ও দল কিভাবে পরিচালনা করা হবে সেই রূপরেখার সারসংক্ষেপ তুলে ধরেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন। রূপরেখার নাম ‘ভিশন-২০৩০’। তিনি বলেন, দেশের বিশিষ্ট জন, পেশাজীবী, বুদ্ধিজীবী ও সবার মতামতের ভিত্তিতে এই ভিশন পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হবে এবং পরবর্তীতে তা জাতির সামনে তুলে ধরা হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ। মাথাপিছু আয় হবে ৫ হাজার মার্কিন ডলার। দেশে সুশাসন নিশ্চিত করতে সংসদে উচ্চ কক্ষ প্রতিষ্ঠা করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য আনা হবে। তিনি আরো বলেন, জনগণের দুর্দশা আমাদের হতাশ করেছে। এমন অবস্থা চলতে পারে না। নষ্ট রাজনীতির আবর্ত থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে দেশ আরও ঘোর অন্ধকারে তলিয়ে যাবে। দেশ বাঁচাতে বিএনপি ভিশন ২০৩০ প্রণয়ন করতে যাচ্ছে। আমরা এমন এক উদার গণতান্ত্রিক সমাজ গড়তে চাই যেখানে সকলের মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার সংরক্ষিত হবে। আমরা সকল মত ও পথকে নিয়ে এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলবো যেখানে বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য গড়ে উঠবে। বাংলাদেশ হবে একটি রেইনবো। জন আকাঙ্খাকে মর্যাদা দিয়ে আমরা রাষ্ট্র পরিচালনা করবো। সব ধরনের অভিজ্ঞতার নির্যাস গ্রহণ করে দেশ পরিচালনাই হবে আমাদের মূল লক্ষ্য।

তিনি বলেন, আগামীতে তৈরি পোশাক শিল্প ও প্রবাসীদের কল্যাণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া হবে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। উৎপাদন ও সেবা খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়া হবে। যাকাত ফান্ডের ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন করে অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজে লাগানো হবে। হজ ব্যবস্থাপনায় বিরাজমান নৈরাজ্য ও দুর্নীতির অবসান ঘটানো হবে। বিএনপি চায় বিভক্ত হওয়া জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে। এজন্য সবার মধ্যে সেতুবন্ধন রচনার প্রয়াস চালানো হবে। প্রতিহিংসার পরিবর্তে ভবিষ্যতে নতুন ধারার রাজনীতি ও সরকার করতে চায় বিএনপি।

সরকারের জুলুম নির্যাতনের কথা উল্লেখ করে খালেদা জিয়া বলেন, অনেকে চরম নির্যাতিত হয়েছেন। অনেকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে গেছে। এই জুলুম ও অস্থিরতা বাংলাদেশ বহন করতে পারে না। আমি নিজেও চরম দুঃখ কষ্ট সয়ে আপনাদের মাঝেই রয়েছি এবং থাকবো। আমি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন। আমার ছোট ছেলে বিদেশে মৃত্যুবরণ করেছে। তারেক রহমানকে হত্যার চেষ্টা হয়েছে। পঙ্গু হয়ে বিদেশে বসবাস করছে। এসব দুঃখ বেদনা বুকে চেপে এদেশের মানুষের অধিকার রক্ষায় চেষ্টা করে যাচ্ছি। বিএনপির জন্য এটি কঠিন সময় হলেও বিএনপি আবার জেগে উঠবে। অন্ধকারের পর্দা দুলে উঠেছে। অচিরেই আলো আসবে। ভবিষ্যৎ আমাদেরই ইনশাআল্লাহ। এটি শুধু সময়ের ব্যাপারমাত্র।

বর্তমান সরকার দেশ ও জাতিকে পেছনে ঠেলে দেয়ার নষ্ট রাজনীতি শুরু করেছে মন্তব্য করে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, দেশে কোথাও কোনো জবাবদিহিতা সুশাসন নেই। নারীর সম্ভ্রম নেই। শিশুরা পর্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। অনাচার, দুর্নীতি আর চরম নৈরাজ্যে মানুষ আজ দিশেহারা।

সরকারের সমালোচনা করেন তিনি বলেন, বাঙালি জাতি হিসেবে আমাদের বর্তমান আজ সংকটে আর ভবিষ্যৎ অন্ধকারে-অনিশ্চিতের পথে। তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের আমলে জাতিকে বিভক্ত, হতাশ ও দিশেহারা করা হয়েছে। জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। সকল স্তরে শৃঙ্খলা ফেরাতে হবে। জনগণকে দিতে হবে পথের দিশা। কাউন্সিল থেকে আসতে হবে পথের দিশা।

খালেদা জিয়া বলেন, দেশ ও জাতিকে পেছনে ঠেলে দেয়ার নষ্ট রাজনীতি সরকার শুরু করেছে। এখনই যদি এ অবস্থা থেকে আমরা বের হতে না পারি তাহলে দেশ ও জাতির অবস্থা আরও খারাপের দিকে যাবে।

এর আগে সকালে জাতীয় পতাকা তুলে কাউন্সিল উদ্বোধন করেন তিনি। এছাড়া বেলুন ও শান্তির প্রতীক পায়রা অবমুক্ত করেন খালেদা জিয়া। কাউন্সিলে দেশের সব প্রান্ত থেকে হাজার হাজার নেতাকর্মী জমায়েত হন। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট ছাড়িয়ে পাশের সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও রমনা পার্কে জড়ো হন নেতাকর্মীরা। প্রসঙ্গত, খালেদা জিয়া বক্তব্য দেয়ার আগে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান ভিডিও কনফারেন্সে বক্তব্য রাখেন।

এদিকে বিএনপির জাতীয় কাউন্সিল অধিবেশনে উদ্বোধনী ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্মরণ করলেন দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, স্বাধীনতার মাস মার্চে এ কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য যারা জীবন উৎসর্গ করেছেন, আমি সেই শহীদদের কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি।

খালেদা জিয়া বলেন, বিএনপির জাতীয় কাউন্সিল থেকে শ্রদ্ধা জানাচ্ছি বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে নিকট প্রতিবেশী ভারতসহ যে সকল দেশ ও বন্ধুপ্রতিম জনগণ সহযোগিতা ও সমর্থন দিয়েছেন, আমি তাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

তিনি বলেন, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও শেখ মুজিবুর রহমানসহ মরহুম জাতীয় নেতাদের অবদানের কথা স্মরণ করছি। তারা দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্যদিয়ে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকে ত্বরান্বিত করেছিলেন।

‘মহান স্বাধীনতার ঘোষক, মুক্তিযুদ্ধের বীর অধিনায়ক, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের স্থপতি, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক, আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার, আমাদের পার্টির প্রতিষ্ঠাতা ও আদর্শের দিশারি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীর উত্তমের প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছি,’ যোগ করেন খালেদা জিয়া।

এ সময় অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন-বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দলের ভাইস চেয়ারম্যান শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, সেলিমা রহমান, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, তরিকুল ইসলাম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আ স ম হান্নান শাহ, ড. আবদুল মঈন খান, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। সঞ্চালনায় ছিলেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান।

অতিথিদের মধ্যে ছিলেন-বিকল্পধারা প্রেসিডেন্ট ড. এ কিউ এম বদরুদ্দোজ্জা চৌধুরী, প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি এমাজউদ্দীন আহমেদ, সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ, শফিক রেহমান, শিক্ষাবিদ মাহবুব উল্লাহ, গণস্থাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। এছাড়া বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট এলডিপির কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, জামায়াতে ইসলামীর তাসনিম আহমেদ, জাতীয় পার্টির আন্দালিব আহমেদ পার্থসহ জোটের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও বিদেশি ডেলিগেট ও কূটনীতিকরা আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদের ধরন : বাংলাদেশ নিউজ : স্টাফ রিপোর্টার