বিস্তারিত

দক্ষিণ চীনসাগর চীনের নয়

ছবি : সংগ্রহকৃত

গার্থ ইভান্স ১৯৮৮-৯৬ মেয়াদে অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন এবং ২০০০-০৯ মেয়াদে
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ান
ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির চ্যান্সেলর। তিনি নিউ ইয়র্কভিত্তিক গ্লোবাল সেন্টার ফর রেসপনসিবিলিটি টু
প্রটেক্টের কো-চেয়ার। প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে প্রকাশিত লেখাটি অনুবাদ করেছেন মাসুম বিল্লাহ

এটা কোনো বিস্ময়ের ব্যাপার ছিল না। দ্য হেগের সালিশি আদালত দক্ষিণ চীনসাগরের ব্যাপারে
ফিলিপাইনের যুক্তিগুলো গ্রহণ করে চীনের দাবি নাকচ করে দিয়েছে। প্রত্যাশার চেয়েও অনেক কঠিন
বাক্য ব্যবহার করে আদালত চীনের দাবির ব্যাপারে চীনসাগরের আইনগত সিদ্ধান্ত দেয়। চীন
এমনভাবে এলাকাটির মালিকানা দাবি করেছিল, যেন এটি তারই ভূখণ্ডের মধ্যে কোনো লেক।
সালিশি আদালতের রায়ে বলা হয়, যে চীনের ‘নাইন-ড্যাশ লাইন’ হলো ১৯৪০ দশকের একটি
বিবরণ মাত্র। যেখানে দক্ষিণ চীনসাগরের ৮০ শতাংশ চীনের মালিকানায় দেখানো হয়েছে,
আইনগতভাবে এটি অর্থহীন। আদালতের রায়ে আরো পরিষ্কার করে দেয়া হয় যে, চীনের বর্তমান
ভূমি পুনরুদ্ধারকার্যক্রম, ডুবে থাকা বা বসতিহীন রিফগুলোকে কৃত্রিম দ্বীপে রূপান্তর, বিমানবন্দর বা
অন্য কোনো অবকাঠামো নির্মাণ অবৈধ। এসব করার অধিকার দেশটির নেই এবং ওই অঞ্চলে অন্য
কোনো দেশের জাহাজ চলাচল বা বিমান উড্ডয়নে বাধাদানের অধিকারও তার নেই।
‘নাইন-ড্যাশ লাইনের’ ব্যাপারে চীন সরকারিভাবে একেবারে নিখুঁত এমন কিছু বলেনি যা দিয়ে বুঝা
যায়; আসলে ঠিক কোন অঞ্চলগুলো সে নিজের আয়ত্তে আনতে চায়। কখনো বলা হয়েছে
‘ঐতিহাসিক অধিকার’; আবার কখনো বলা হয়েছে ‘চীনের ঐতিহ্যগত মৎস্য আহরণ ক্ষেত্র’। তাই
অনেকেই বলছেন, এটা হলো এক কথায় পুরো দক্ষিণ চীনসাগরের ওপর মালিকানা দাবি। স্বীকৃত
সার্বভৌম মালিকানার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত নয় এমন সমুদ্র ক্ষেত্রের দাবিতে ‘ঐতিহ্যগত’ বা
‘ঐতিহাসিক’ যুক্তি আন্তর্জাতিক আইন স্বীকার করে নেয় বলে এত দিন যে ধারণা ছিল, তা নাকচ করে
দিয়েছে সালিশি আদালত। কোনো বসতিযোগ্য দ্বীপের স্বীকৃত মালিকানাও মূল ভূখণ্ডের মতো ১২
নটিক্যাল মাইল ‘টেরিটরিয়াল সি’। এর সাথে রয়েছে ২০০ নটিক্যাল মাইল এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক
জোন বা ইইজেড এবং সংশ্লিষ্ট কোনো কনটিনেন্টাল শেলফের ওপর অধিকার (অন্যদের অধিকারের
সাথে ওভারলেপিং হচ্ছে কি না তা বিবেচনা সাপেক্ষে)। কোনো বসতিহীন পাথর বা কোনো রিফের
মালিকানার স্বীকৃতি কেবল এই ১২ নটিক্যাল মাইলের টেরিটরিয়াল সি’র মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এর চেয়ে
বেশি কিছু নয়। ভূখণ্ড ছাড়া একটি রাষ্ট্র সাগরের ওপর মালিকানা দাবি করতে পারে না।
কিন্তু চীন পারে এবং তারা তা করেও যাবে। ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন ও অন্য দেশের দাবি সত্ত্বেও চীন
ভূমির বৈশিষ্ট্য সামনে এনে বলছে, সে বসতিযোগ্য দ্বীপগুলো এবং স্পার্টলি ও প্যারাসেল দ্বীপপুঞ্জ
এবং আশপাশের স্থায়ীভাবে বহির্মুখীভাবে সম্প্রসারিত শিলা বা রিফগুলোর সার্বভৌম মালিকানার
অধিকার। চীন দাবি বজায় রাখার জন্য ‘কার্যকর দখলদারিত্বের’ মতো গ্রহণযোগ্য আইনি নির্ণায়কের
আশ্রয় নিতে পারে; কিন্তু সালিশি আদালত ফিলিপাইনের ক্ষেত্রে সার্বভৌমত্বের এসব অন্তর্নিহিত
ইস্যুগুলোর একটিও আমলে নেয়নি বা আলোচনা করেননি; এবং গভীর বিবেচনায় বলতে হয়,
আলোচনা, সালিশ বা বিচারের মাধ্যমে কোনো দিন যদি দক্ষিণ চীনসাগরের ওপর বেইজিংয়ের
সার্বভৌমত্বের দাবি প্রতিষ্ঠিত হয়, তার পরও নাইন-ড্যাশ লাইনের মাধ্যমে যে বিস্তীর্ণ অঞ্চল পরিবেষ্টন
করা হয়েছে তার গোটা এলাকা তথা উপকূলীয় সাগর, ইইজেড এবং কনটিনেন্টাল শেলফের ওপর
অধিকার সেগুলো ওই দাবির আওতায় আসবে না।
চীন তার ব্যাপক পুনরুদ্ধার তৎপরতা এবং সামরিক বিমানবন্দর, সাপ্লাই প্লাটফরম, কমিউনিকেশন
ফ্যাসিলিটিজ এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা নির্মাণের ওপর নিবিড় তদারকি কার্য
চালানোর যে সীমাহীন অধিকার দাবি করেছে তা-ও নাকচ করে দিয়েছে সালিশ আদালত। স্পার্টলি
দ্বীপপুঞ্জের এমন সাতটি স্থানে এসব স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে; যেগুলো আগে কেউ অধিকার করেনি।
এগুলো হচ্ছে- মিসচিফ রিফ, সুবি রিফ, গাভেন রিফ এবং হুগাস ফিল (এর সবগুলোই আগে
জোয়ারের সময় পানিতে তলিয়ে যেত), এবং জনসন সাউথ রিফ কুয়ার্তেরন রিফ, ফিয়েরি ক্রস রিফ
(এগুলো জনবসতিহীন এবং জোয়ারের সময় এগুলোর কিছু অংশ পানিতে তলিয়ে যায়)।
ইউনাইটেড নেশন্স কনভেনশন অন দ্য ল অব দ্য সিজ বা সংক্ষেপে ‘আনক্লস’ অনুযায়ী কোনো দেশ
তার নিজের ইইজেড এলাকার মধ্যে কৃত্রিম দ্বীপ বা স্থাপনা নির্মাণ করতে পারে। দূরবর্তী সমুদ্রেও
পারে, তবে তা কেবল শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে; কিন্তু ডুবে থাকা রিফকে ‘পাথুরে দ্বীপে’ পরিণত করা বা
কোনো জনবসতিহীন ‘পাথুরে দ্বীপকে’ জনবসতিপূর্ণ দ্বীপ হিসেবে দেখালে তা আইনগতভাবে বৈধ হবে
না। ফিলিপাইনের মামলাটি এই মৌলিক নীতিমালাকেই আরো সুদৃঢ় করেছে। এটা করতে গিয়ে
সালিশ আদালত স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছে, যা খুশি করার অধিকার চীনের নেই। অন্তুত আগে পানিতে
ডুবে থাকা মিসচিফ রিফের ক্ষেত্রে তো নয়ই। ফিলিপাইন এই রিফকে নিজের ইইজেডের আওতায়
বলে দাবি করে আসছে।
এখনো যেসব দ্বীপ, রিফ বা রকে সামান্য পায়ের অঙ্গুলিতে ভর দিয়ে দাঁড়ানোর সুযোগ আছে,
সেগুলোর ওপর থেকে চীন দখল ছেড়ে দেবে বলে মনে হয় না। এমনকি দক্ষিণ চীনসাগরের বেশির
ভাগ ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর সার্বভৌম মালিকানার দাবিও বন্ধ করবে না; কিন্তু আঞ্চলিক
স্থিতিশীলতার স্বার্থে সবার উচিত হবে চীনকে এমন পদক্ষেপ নিতে উৎসাহিত করা, যাতে তার মুখ
রক্ষা হতে পারে। এসব পদক্ষেপের মধ্যে থাকতে পারে স্পার্টলির সাতটি নতুন কৃত্রিম দ্বীপে দৃষ্টিকটু
ধরনের সামরিক নির্মাণ বন্ধ করা; নতুন কোনো পুনরুদ্ধার কাজ শুরু না করা; ভূমির বৈশিষ্ট্য তুলে
ধরার বদলে কেবলের ‘নাইন-ড্যাশ লাইন’ উদ্ধৃতি দেয়া বন্ধ করা; অন্তত সত্যিকারের লেনদেন নীতির
ওপর ভিত্তি করে এসব দাবি পেশ করা এবং ভালো হবে সালিশ বা বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তির
চেষ্টা করা। দক্ষিণ চীনসাগরের সাথে জড়িত সব পক্ষের জন্য একটি আচরণবিধি তৈরির জন্য আসিয়ান
দেশগুলোর সাথে আলোচনার পথে অগ্রসর হওয়া এবং এই ইস্যুতে আসিয়ানের দুর্বল পয়েন্ট যেমন
কম্বোডিয়া ও লাওসের মতো দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করে জোটে ভাঙন ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি
থেকে বিরত থাকা।
এর বিপরীতে পিপলস লিবারেশন আর্মির উষ্ণ মস্তিষ্কের প্রভাবে দেশটি নাটকীয়ভাবে আরো কঠিন পথ
বেছে নিতে পারে। আনক্লসকে প্রত্যাখ্যানের পাশাপাশি দক্ষিণ চীনসাগরে নিজের দাবিকৃত অঞ্চলে
একটি এয়ার ডিফেন্স আইডেন্টিফিকেশন জোন ঘোষণা করতে পারে, যা নিশ্চিতভাবে উপেক্ষা করবে
যুক্তরাষ্ট্র। এর ফলে সামরিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে, যার ফলাফল পুরোপুরি অনিশ্চিত।
আনক্লস থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্তও হবে পুরোপুরি পাগলামি। চীন এখনো এর শর্তাবলী,
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং প্রথাসিদ্ধ আন্তর্জাতিক আইনগুলো মানতে বাধ্য। অবজ্ঞার মনোভাব
দেশটির সুনামের পাশাপাশি অন্যান্য ভূখণ্ডগত স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। জাপানের সাথেও তার পূর্ব
চীনসাগরে বিরোধ রয়েছে, আনক্লসের কনটিনেন্টাল শেলফ ধারার আওতায় ওই বিরোধের মীমাংসা
হবে।
চীন যদি কঠোর পথ বেছে নেয়, অথবা আগামী দিনগুলোতে তার মনোভাবে উল্লেখযোগ্যমাত্রায়
নমনীয় করতে না পারে; তাহলে আমার দেশের (অস্ট্রেলিয়া) মতো আরো অনেকে বাধ্য হবে বিভিন্ন
ইস্যু যেমন- মিসচিফ রিফের ১২ নটিক্যাল মাইলের মধ্যেই জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতার জন্য
আন্তর্জাতিকভাবে চাপ সৃষ্টি করতে। তবে, এই মুহূর্তে সবার স্বার্থেই চীনকে কিছুটা স্থান দেয়া উচিত,
যাতে সে তার গতিপথ নির্ধারণ করতে পারে এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা বেড়ে যাওয়ার বদলে কমে
আসে।

সংবাদের ধরন : মতামত নিউজ : স্টাফ রিপোর্টার