বিস্তারিত

কিউবার ভাগ্য অন্য কেউ নির্ধারণ করবে না

all bangla newspaper ছবি : সংগ্রহকৃত

হাভানার হোসে মার্তি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। স্থানীয় সময় রোববার বিকেল ঠিক ৪টা ২৯ মিনিটে বিমানবন্দরের রানওয়ে স্পর্শ করল এয়ারফোর্স ওয়ানের চাকা। চূড়ান্ত পরিণতি পেল কমিউনিস্ট রাষ্ট্র কিউবার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন পথচলা।
এক রানওয়ে-বিশিষ্ট এই বিমানবন্দরেই গত শতকের ষাটের দশকে বোমা ফেলেছিল মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ। সেখানে থাকা রুশ নির্মিত জরাজীর্ণ উড়োজাহাজগুলো এবং মান্ধাতার আমলের টার্মিনাল কিউবার ওপরে গত ৫০ বছরের মার্কিন অবরোধের প্রভাবের সাক্ষ্য দিচ্ছিল। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ছাতা মাথায় যখন সপরিবারে উড়োজাহাজের সিঁড়ি বেয়ে নামলেন, তখন তিনি উষ্ণ অভ্যর্থনাই পেলেন। কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেজ এগিয়ে গিয়ে ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামা ও ওবামা দম্পতির দুই মেয়ের হাতে তুলে দেন ফুলের তোড়া।
তিন দিনের এই ঐতিহাসিক সফরের দ্বিতীয় দিন গতকাল সোমবার কিউবার প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রোর সঙ্গে বৈঠক করেন প্রেসিডেন্ট ওবামা। হাভানায় প্যালেস অব দ্য রেভল্যুশনে বৈঠকে ওবামা দুই দেশের সম্পর্কে নতুন দিনের সূচনার প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে কিউবার বিভিন্ন বিষয়ে অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের নানা হস্তক্ষেপের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘কিউবার ভাগ্য যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো দেশ নির্ধারণ করবে না।’
রাউল তাঁর দেশের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ‘অবরোধের’ প্রসঙ্গ তুলে বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক পুরোপুরি স্বাভাবিক করতে এটা তুলে নেওয়া দরকার। তিনি বলেন, ‘আমাদের দুই দেশের মধ্যে গভীর মতপার্থক্য রয়েছে, যা চলতে দেওয়া যায় না। সেই সব বিষয় নিয়ে আমাদের কাজ করতে হবে, যা আমাদের আরও কাছাকাছি আনবে।’
রাউলের সঙ্গে বৈঠকের আগে গতকাল স্পেনের বিরুদ্ধে কিউবার স্বাধীনতাসংগ্রামে জীবন উৎসর্গকারী বীর হোসে মার্তির সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন ওবামা। হাভানার কেন্দ্রে মার্তির ভাস্কর্যের পাদদেশে স্মারক বইয়ে স্বাক্ষর করেন তিনি।
প্রেসিডেন্ট ওবামার এই সফরে প্রধানত দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘ অবহেলিত বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিবিড় করার ওপর আলোকপাত করা হবে। পাশাপাশি ওবামা কিউবার মানবাধিকার পরিস্থিতির বিষয়ে নিজের কঠোর অবস্থানও জানান দেবেন।
রোববার হাভানায় পৌঁছানোর পর ওবামা প্রথমেই যান মার্কিন দূতাবাসে। কিউবায় ওবামার পা রাখার আগে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ ছিল এই দূতাবাস পুনরায় খুলে দেওয়া। দূতাবাসে পৌঁছে তিনি এর কর্মীদের উদ্দেশে বলেন, এখানে আসতে পারার বিষয়টি চমৎকার এক অভিজ্ঞতা। এটা একটি ঐতিহাসিক সফর, একটি ঐতিহাসিক সুযোগ।
৮৮ বছরের মধ্যে ওবামাই প্রথম ব্যক্তি, যিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদে আসীন থাকা অবস্থায় কিউবায় গেলেন। দূতাবাসের কর্মীদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যেও সেটি উল্লেখ করতে ভুললেন না তিনি। বললেন, এর আগে ১৯২৮ সালে প্রথমে ট্রেনে; তারপর যুদ্ধজাহাজে চড়ে কিউবা এসেছিলেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ক্যালভিন কুলিজ। সময় লেগেছিল তিন দিন। আর এখন তিনি এলেন এয়ারফোর্স ওয়ানে চড়ে। সময় লাগল মাত্র তিন ঘণ্টা। পরে ওবামা হাভানা শহরের পুরোনো এলাকা পরিদর্শনে বের হন। সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী মিশেল, দুই মেয়ে সাশা ও মালিয়া এবং শাশুড়ি মারিয়ান রবিনসন। মৌসুমি ঝড়-বৃষ্টির কারণে তখনো তাঁদের মাথার ওপর ছাতা ধরে চলতে হয়। এরপরে যান কিউবার জাতীয় ক্যাথেড্রাল ও স্থানীয় একটি জাদুঘরে। এ সময় এক কিউবান চেঁচিয়ে ওঠেন, ‘অবরোধ নিপাত যাক’। প্রেসিডেন্ট ওবামা ইতিবাচকভাবে হাত নেড়ে তাতে সায় দেন। যুক্তরাষ্ট্র-কিউবা সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে ৫৪ বছরের এই বাণিজ্যিক অবরোধই এখন সবচেয়ে বড় বিষফোড়া।
সফরের শেষ দিন আজ মঙ্গলবার কিউবার রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীদের সঙ্গে বৈঠক করবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এই সফরে যে গুটি কয়েক ইস্যু আলোচিত হচ্ছে, তার মধ্যে অন্যতম এটি। হোয়াইট হাউস আগেই জানিয়ে দিয়েছে, কিউবা পছন্দ করুক বা না করুক, ওবামা এই বৈঠক করবেনই।
পর্দার অন্তরালে প্রায় দেড় বছর ধরে চলা সমঝোতার ফল হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার মধ্যে গত আগস্টে পাঁচ দশক পর আবার কূটনৈতিক সম্পর্ক চালু হয়। ওবামার এ সফরকে সেই সমঝোতার চূড়ান্ত রূপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সংবাদের ধরন : আন্তর্জাতিক নিউজ : বিডি নিউজ