বিস্তারিত

ইন্দিরা গান্ধীর বিশ্বস্ত সৈনিক ছিলেন প্রণব মুখোপাধ্যায়

ছবি : সংগ্রহকৃত

সফল রাজনীতিক থেকে প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতি। কীর্ণাহার থেকে রাইসিনা হিলসে এক বাঙালির যাত্রা যেন তৈরি করেছিল ভারতের এক রাজনৈতিক অধ্যায়। সোমবার তাঁর মৃত্যুতে সেই অধ্যায়ের অবসান।

রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর যেমন তাঁর গায়ে আর কোনও রাজনৈতিক রঙ লাগেনি। তেমনই তার আগে কংগ্রেসের অন্যতম বিশ্বস্ত সৈনিক ছিলেন প্রণববাবু। অথচ, সেই প্রণব মুখোপাধ্যায়কে একসময় কার্যত দরজা দেখিয়ে দিয়েছিলেন রাজীব গান্ধী।

রাজীব গান্ধীর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তুখোড় রাজনীতিক প্রণব মুখোপাধ্যায়ও সেদিন আঁচ করতে পারেননি, তাঁর সঙ্গে ঠিক কী হতে চলেছে। শুধু মন্ত্রিসভা থেকে নয়, কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটি থেকেও সরিয়ে দেওয়া হয় তাঁকে। অথচ সেই প্রণব বাবুই পরবর্তীকালে হয়ে উঠেছিলেন কংগ্রেসের চাণক্য। সোনিয়া-রাহুলদের অন্যতম পরামর্শদাতা। কংগ্রেসের ক্রাইসিস ম্যানেজারও বলা হত তাঁকে।

১৯৬৯ সালে রাজ্যসভায় প্রবেশ করেন বাংলা কংগ্রেসের প্রতিনিধি হয়ে। পরবর্তীকালে কংগ্রেসের সঙ্গে যোগাযোগ ও ঘনিষ্ঠতায় ইন্দিরাই নাকি ছিলেন তাঁর রাজনৈতিক মেন্টর। সেইসময় তরতর করে রাজনীতির সিঁড়িতে উপরে উঠে গিয়েছিলেন প্রণব।

১৯৬৯-এ রাজ্যসভায় প্রাথী হয়ে পার্লামেন্টারি পলিটিক্সে প্রবেশ তাঁর। এরপর থেকেই ইন্দিরা গান্ধীর অন্যতম বিশ্বস্ত সৈনিক হয়ে ওঠেন তিনি। এমার্জেন্সি থেকে শুরু করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, সবকিছুতেই ইন্দিরার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। ১৯৭৭ সালে ইন্দিরা গান্ধীর পরাজয় ঘটলে অনেকে সেইসময় তাঁকে ছেড়ে আসলেও প্রণববাবু তাঁর পাশেই ছিলেন। ফলে, দুর্দিনে ওভাবে পাশে থাকায় তিনি হয়ে ওঠেন প্রিয়দর্শীনীর বিশ্বাসভাজন।

কিন্তু সবকিছু বদলে যেতে শুরু করে ইন্দিরার মৃত্যুর পর। ৩১ অক্টোবর, ১৯৮৪। পাশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক প্রচারের কাজে এসেছিলেন প্রণব মুখোপাধ্যায় ও রাজীব গান্ধী। ইন্দিরার মৃত্যুর খবর পেয়েই দু’জনে দিল্লি ছুটে যান। যাওয়ার পথে দু’জনের মধ্যে কী কথোপকথন হয়েছিল, তা জানেন না কেউ।

অথচ পরবর্তীকালে সেই কথোপকথন নিয়ে অনেক জল্পনা হয়। শোনা যায়, প্রণব বাবু বলেছিলেন, কোনও সিনিয়র নেতাকেই প্রধানমন্ত্রী করা হয়ে থাকে। কংগ্রেসে গুঞ্জন উঠেছিল, প্রণববাবু প্রধানমন্ত্রী হতে চান। সম্ভবত সেইজন্যই পরে রাজীবের মন্ত্রিসভায় ঠাঁই হল না তাঁর।

১৯৮৪-র ৩১ ডিসেম্বর, রাজীব গান্ধী সকাল ১১ টায় সিপিপি নেতা নির্বাচিত হব। সেদিনের মিটিং-এ নেতৃত্বে দেন প্রণববাবু। এমনকি রাজীবের পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। সেখানেই রাজীব ঘোষণা করেন, বিকেল ৩ টেয় শপথ নেবেন তিনি। এরপর থেকে রাজীবের ডাকের অপেক্ষা করতে থাকেন তিনি। তাঁকে যে মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে, তা কল্পনাও করেননি প্রণববাবু। এমনকি দলের কোনও সদস্যও তাঁকে এমন কোনও ইঙ্গিত দেননি। কোনও গুজবও শোনেননি তিনি।

প্রণববাবু লিখেছিলেন, রাজীব গান্ধীর বন্ধুরা কীভাবে রাজীবকে তাঁর বিরুদ্ধে প্ররোচিত করেছিল। যদিও নিজেকে শান্ত রাখতেন প্রণব বাবু। তবে ধীরে ধীরে তিনি বুঝতে পারছিলেন যে তাঁকে কোনঠাসা করে দেওয়া হচ্ছে।

১৯৮৬-র জানুয়ারিতে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি থেকে তাঁকে বাদ দেওয়া হয়। আর সেটাই ছিল সবথেকে বড় ধাক্কা তাঁর জন্য। মন্ত্রিসভা থেকে সরানোর থেকেও বড় ধাক্কা ছিল এটি। ১৯৭৮ থেকে একটানা কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটিতে স্থায়ী জায়গা ছিল তাঁর।

১৯৮৬-র ২৬ এপ্রিল সংবাদমাধ্যম থেকে খবর পান যে তাঁকে ৬ বছরের জন্য দল থেকে বহিস্কার করা হয়েছে। কার্যত তাঁকে রাস্তা দেখিয়ে দেওয়া হয়েছিল। দলের কেউ তাঁকে জানানোর প্রয়োজনও বোধ করেননি।

এরপরন ওই বছরেই রাষ্ট্রীয় সমাজবাদী কংগ্রেস নামে নিজের দল ঘোষণা করেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। পশ্চিমবঙ্গে গঠিত হয় সেই দল। পরে রাজীবের সঙ্গে সমঝোতায় কংগ্রেসের সঙ্গে মিশে যায় প্রণবের দল।

পরে রাজীব নিজেও স্বীকার করেছিলেন যে মা ইন্দিরার সবথেকে বিশ্বস্ত লোক প্রণব মুখোপাধ্যায়ের ব্যাপারে তাঁকে ভুল বোঝানো হয়েছিল।

রাজীব গান্ধীর মৃত্যুর পর কংগ্রেসে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের জায়গা আরও পোক্ত হয়। নরসিংহ রাওয়ের আমলে প্ল্যানিং কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান হন তিনি এবং পরে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীও হন।

প্রণব কুমার মুখোপাধ্যায় ভারতের ত্রয়োদশ রাষ্ট্রপতি (জুলাই, ২০১২-এ কার্যভার গ্রহণকারী) ছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক কর্মজীবন ছয় দশকব্যাপী। তিনি ছিলেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা। বিভিন্ন সময়ে ভারত সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রকের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছিলেন। ২০১২ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগে প্রণব মুখোপাধ্যায় ছিলেন ভারতের অর্থমন্ত্রী ও কংগ্রেসের শীর্ষস্থানীয় সমস্যা-সমাধানকারী নেতা।

সংবাদের ধরন : আন্তর্জাতিক নিউজ : নিউজ ডেস্ক