বিস্তারিত

আদালত কক্ষে স্বাভাবিক ছিলেন খালেদা জিয়া

ছবি : সংগ্রহকৃত

রাজধানীর বকশিবাজারের বিশেষ আদালতের কক্ষে দুপুর ২টা প্রবেশ করেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। পরনে ছিল সাদা শিফনের শাড়ি। তিনি নিজের আইনজীবী ও দলের নেতাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেই এজলাসের সামনে রাখা নিজের আসনে বসেন।

আদালতে প্রবেশের পর থেকেই সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ধীর, স্থির ও শান্ত। তাঁকে চিন্তিত মনে হয়নি, তাঁর আচরণ ছিল স্বাভাবিক। তিনি চেয়ারের হাতলে কনুই রেখে কপালে আঙুল দিয়ে ঠেস দিয়ে রাখেন এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। আদালতে এ সময় নীরবতা নেমে আসে। সবার চোখেমুখে ছিল উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। এর মধ্যেই খালেদা জিয়া রায়ের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন।

খালেদা জিয়ার চেয়ারের সামনে একটি টুল রাখা ছিল। টুলের ওপর টিস্যু বক্স, পানির বোতল ও খালেদা জিয়ার ব্যবহৃত ব্যাগটি রাখা হয়। খালেদা জিয়ার পাশেই ছিলেন জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস ও সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমদ এবং পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন তাঁর ব্যক্তিগত গৃহকর্মী। এ ছাড়া সেখানে খালেদা জিয়াকে ঘিরে ছিলেন তাঁর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা বেসরকারি চেয়ারপারসন সিকিউরিটি ফোর্সেস (সিএসএফ) সদস্যরা।

খালেদা জিয়ার পেছনে আদালতের কাঠগড়ায় ছিলেন এই মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া অন্য দুই আসামি ব্যবসায়ী সলিমুল হক কামাল ও শরফুদ্দিন আহমেদ।

বিচারক ড. আখতারুজ্জামান দুপুর ২টা ৬ মিনিটে এজলাসে বসেন। তারপরই তিনি আদালত কক্ষ থেকে খালেদা জিয়ার নিরাপত্তার জন্য নিয়োজিত সিএসএফ সদস্যদের বের করে দেওয়ার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি নির্দেশ দেন। দায়িত্বরত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা তখন সেখান থেকে সিএসএফ সদস্যদের বের করে দেন।

এই অবস্থায় আদালত কক্ষে খালেদা জিয়ার আশপাশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি বেড়ে যায়। খালেদা জিয়ার সামনে বিচারকের এজলাস, বামপাশে তাঁর আইনজীবী ও বিএনপি নেতারা, তার পরে ছিলেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও অন্য কর্মকর্তারা। আর ডান পাশে ছিলেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষকারী বাহিনীর সদস্যরা।

বিচারক ২টা ১৩ মিনিটের দিকে রায় পড়া শুরু করেন। তিনি বলেন, ‘এ মামলায় মোট ৬৩২ পৃষ্ঠার রায় দেওয়া হবে। এখানে যেহেতু সবটুকু পড়া সম্ভব না, তাই সংক্ষিপ্ত রায় পড়া হবে।’

এরপর বিচারক অল্প সময়ের মধ্যেই মূল রায় পড়া শেষ করেন। বিচারক বলেন, ‘আসামিদের অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় দণ্ডবিধি ৪০৯ ধারা অনুযায়ী তাদের দোষী সাব্যস্ত করা হলো।’

এর পরই আদালত আসামিদের সাজা ঘোষণা করেন। প্রথমে বিএনপির জ্যেষ্ঠ ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ অন্য পাঁচ আসামির সাজার রায় ঘোষণা করা হয়। তাদের মোট ১০ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড ও দুই কোটি ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

বিচারক এইটুকু পড়ার পরই ডান পাশ থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা খালেদা জিয়ার খুব কাছাকাছি চলে আসেন। এ সময় খালেদা জিয়া নিশ্চুপভাবে আদালতের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তিনি ছিলেন অভিব্যক্তিহীন।

এরপর বিচারক খালেদা জিয়ার পাঁচ বছরের সাজার রায় ঘোষণা করেন। তারপর কালবিলম্ব না করে রায়ের কপি হাতে নিয়ে নিজের খাস কামরার দিকে চলে যান এবং দরজা বন্ধ করেন দেন।

রায় ঘোষণার পর পরই খালেদা জিয়ার আইনজীবী ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন আদালতের উদ্দেশে চিৎকার করে বলে উঠেন, ‘ফলস রায়, ফলস রায়, ফলস রায়।’ এ সময় আইনজীবী ও বিএনপি নেতাদের অনেকেই কেঁদে ফেলেন। কেউ কেউ তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন। অপরদিকে দুদকের আইনজীবীদের চোখেমুখে স্বস্তির ভাব লক্ষ করা যায়।

খালেদা জিয়ার সাজার রায় ঘোষণার পর পরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাঁকে চতুর্পাশ থেকে ঘিরে ফেলেন। এ সময় তিনি কার্যত তাঁর আইনজীবীদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। তখনো তিনি নিজের আসনে বসে ছিলেন।

তখন অন্য আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন, আবদুর রেজাক খান, মওদুদ আহমেদ, এ জে মোহাম্মদ আলী খালেদা জিয়ার কাছে যেতে চাইলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের কাছে ঘেঁষতে দেয়নি।

খানিক পরে অবশ্য আইনজীবী ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, সানাউল্লাহ মিয়া, মাসুদ আহমেদ তালুকদার খালেদা জিয়ার কাছে যান এবং তার সঙ্গে রায় নিয়ে সংক্ষিপ্ত পরামর্শ করেন। পরে তাঁরা সাংবাদিকদের জানান, খালেদা জিয়া জানিয়েছেন, এই রায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন। তিনি দেশবাসীকে শান্ত থাকার ও ধৈর্য্য ধরার পরামর্শ দিয়েছেন।

আগে থেকেই আদালতের দরজায় দুটি প্রিজন ভ্যান ও একটি মাইক্রোবাস রাখা ছিল। খালেদা জিয়া এবং তাঁর গৃহকর্মীকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সরাসরি মাইক্রোবাসে তুলে দরজা বন্ধ করে দেন। এ সময় আশপাশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ছাড়া আর কাউকে কাছে ঘেঁষতে দেওয়া হয়নি। তাদের নিয়ে যাওয়া হয় পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডের পুরাতন কারাগারে। সেখানে ডে-কেয়ার সেন্টারের ভিআইপি নারী সেলে তাঁকে রাখা হবে বলে জানা গেছে।

মামলায় খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান ছাড়া অন্য আসামিরা হলেন মাগুরার সাবেক সংসদ সদস্য কাজী সালিমুল হক কামাল, ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মমিনুর রহমান।

সংবাদের ধরন : র্শীষ সংবাদ নিউজ : নিউজ ডেস্ক